টিকটক থেকে পার্ফিউম মেইকিং জার্নি – বেশ অ্যালার্মিং একটা জিনিস! যদি সুস্থ থাকতে চান, বেঁচে থাকতে চান পোস্টটা পুরোটা তো পড়বেনই সাথে শেয়ারও করবেন, সব জিনিস ইগ্নোর করা ঠিক না৷
.
বেশকিছুদিন বা বছরখানেক ধরেই খেয়াল করছি যে, বাংলাদেশে টিকটক পার্ফিউমারদের দৌরাত্ম্য ব্যাপক বেড়েছে, এদের একটা প্যাটার্ণ বেশ কমন তা হচ্ছে, এরা ভ্লগ সিষ্টেমে ভিডিও মেইক করে পেইজে ছাড়ে এবং এদের মেইন স্টোরিলাইন থাকে, “কিভাবে শুন্য থেকে ১ লাখ টাকা সেল করলাম”, ” কিভাবে লাখ টাকার স্টুডিও সেটাপ করলাম”, “কিভাবে কি টাট্টি বানালাম” হ্যানত্যান। এরপর প্রতিযোগিতায় নামে কার থেকে কে কত কমে সেল করতে পারে, তাদের টার্গেট কাস্টমার আমার মতে র্যাণ্ডম টিকটকার বা গ্রামের চাচাতো ভাই টাইপের লোকজন, যারা বিভিন্ন পার্ফিউম গ্রুপে পোস্ট দেয় “গেরাল ফেরেণ্ডের সাথে প্রথম ডেট করতে যাবো ৫০০ টাকায় একটা ভালা পার্ফিউম সাজেশন দেন” কিন্তু এসব ৫০০ টাকার ভালো পার্ফিউম যে কতটা ক্ষতিকর তা আপনারা ঘুণাক্ষরেও টের পাবেন না৷ আর কিছুটা সচেতন কাস্টমার হলেও কেউ এসব নিবেনা৷
.
টিকটকার পার্ফিউমারদের ভ্লগগুলোতে দেখবেন ওদের সোর্স হচ্ছে “মিডফোর্ড”, তারা মিডফোর্ড থেকে পার্ফিউম অয়েল কিনে আনে এরপর সেটাকে রেডিমেড প্রি-মিক্সিং এর সাথে মেশায় তাও প্লাস্টিকের জগে এবং বিটার দিয়ে সেটাকে ব্লেণ্ডিং করে স্প্রেয়িং বডি তে ঢেলে একটা ফ্যান্সি লেবেল লাগিয়ে সেল করে, ব্যাস! পার্ফিউম রেডি৷ কিন্তু এইযে এরা পার্ফিউমগুলো আপনাকে বানিয়ে দিচ্ছে এদের পার্ফিউম সলভেন্ট এর গ্রেড কি আপনি জানেন? কি কি ইনগ্রেডিয়্যান্টস ইউজ করছে তা জানেন? জানেন না। তাহলে কোন ভরসায় কেনেন এই জিনিসগুলো? টিকটকার পার্ফিউমারদের আরেকটা ফেনোমেনা আছে একটা তো হচ্ছে কেউ কেউ সোর্স দেখায় দেয়, মানে ওরা যে পার্ফিউমারি সম্পর্কে কিছু জানেনা এটা মোটামুটি বোঝা যায়, কারণ তাদের মূল কনসার্ণ শুধুই টাকা কামানো এটা ক্লিয়ার কিন্তু আরেকটা শ্রেণী আছে যারা মেইন বাটপারিটা করে, ইভেন তারা এমনভাবে মার্কেটিংটা করে যেন মনে হয় যে ওরা পার্ফিউমের খুব এক্সপার্ট, এরা একটা বড় রেড ফ্ল্যাগ।
.
যেমন কিছুদিন আগে একটা পেইজ দেখলাম যারা বলতেছে তারা যেই পার্ফিউমগুলো বানায় তার কম্পাউণ্ড অয়েল নাকি দুবাই থেকে ম্যাচ করে বানিয়ে নিয়ে আসে, দেখেন অবস্থা! ঐ ছেলের চেহারা দেখে আমার মনে হয়েছে হয়তো জীবনে কোনোদিন পাসপোর্ট অফিসেও যায় নাই সেও নাকি অয়েল ইম্পোর্ট করে আনে, তাও আবার ওর অয়েলগুলো প্লাস্টিকের কৌটায় রাখা৷ আরেকটা পেইজ ৯০০ টাকায় ৩০ মি.লি. করে ৬০ মি.লি. পার্ফিউম দেয়, তাদের দাবী তারা ইউরোগ্রেড অয়েল ইউজ করে, টু বি অনেস্ট ” ইউরোগ্রেড” বলে কোনো টার্ম নেই এটা একটা হুক নেইম যেন আপনি এটাকে স্পেশাল কিছু মনে করেন, কিন্তু ইউরোগ্রেড মারার পরেও যখন ওদের পার্ফিউমের প্রচুর নেগেটিভিটি তখন ওরা দাবী করলো তারা নাকি ফেরমেনিহ মানে DSM Firmenich থেকে অয়েল ইম্পোর্ট করে। কিন্তু এই চাপাটা মারার আগে তাদের জানা দরকার ছিলো ফেরমেনিহ প্রত্যেক ইম্পোর্টারকে একটা ইউনিক আইডি দেয়, এবং সেই আইডি অনুযায়ীই তাদের এড্রেস করে, আমার যেহেতু ওদের মেইন HQ পর্যায়ে যোগাযোগ আছে আমি জিজ্ঞাসা করে জানতে পেরেছি যে ওদের ইম্পোর্টের দাবী পুরোপুরি ভুয়া৷ বাংলাদেশীদের মধ্যে কারা ওদের ইম্পোর্টার তার পুরো লিস্ট আমার কাছে আছে।
.
এখন তারা বলতে পারে যে তারা থার্ড পার্টি দিয়ে আনিয়েছে যেহেতু তারা আবার গ্যাজেট ব্যবসায়ীও, কিন্তু এখানে জেনে রাখা ভালো যে ফেরমেনিহ বাল্ক ছাড়া প্রোডাক্ট দেয় না৷ তারচেয়েও বড় কথা হচ্ছে পি গ্রেড সলভেন্ট আর ফিক্সেটিভ ইউজ করলে ৬০ মি.লি. ৯০০ তে দেয়া পসিবল না, কারণ এই দামে একটা পার্ফিউমের লেয়ারিং পিরামিড মিনিমাম প্রোডাকশনে ক্রিয়েট করা ইম্পসিবল, মিনিমাম প্রোডাকশন ধরেন ৫০ লিটার, ওরা কত লিটার তৈরি করে? তাছাড়া তাদের ভিডিওগুলোর ব্যাকগ্রাউন্ডে দেখা যায় যে, প্লাস্টিকের বোতলে থরে থরে সাজিয়ে রাখা পার্ফিউম অয়েলস, আর ইন্টারন্যাশনাল কোনো ব্র্যাণ্ড এভাবে অয়েল দেয় না। আর তারা যদি সরাসরি ইম্পোর্টই করে তাহলে ৫০/১০০ মি.লি. করে তো জীবনে আনতেও পারবেনা, এটা সম্ভব না। হ্যাঁ এগুলো বলে কাস্টমারকে মুরগী বানানো যদিও সহজ।
.
ইউসুফ ভাইয়ের কারণে পার্ফিউমারিতে যেই ট্র্যাজিক চেঞ্জটা এসেছে তা ধীরে ধীরে ভয়ঙ্কর দিকে যাচ্ছে, মানুষ কোনোরকম অয়েল আনছে আর প্রি মিক্সিং আনছে তা মিক্স করেই পার্ফিউম বানিয়ে ফেলছে, এখন যে যা-ই বলুক সবার উদ্দেশ্য কিন্তু পয়সা কামানো, এবার সেটা যেভাবেই কামানো যায় যাক৷ কারণ যারা প্রি-মিক্সিং বানায় তারাই একেকটা বাটপার, ওরা গ্রেডলেস একটা ইথানলে ইচ্ছামতো ফিক্সেটিভ মিক্স করে যা ইচ্ছা তা-ই একটা বানিয়ে সেল করছে আর সবাই কিনছে৷ এখন আপনি বলেন, আপনি কি পোলাও রান্না করার টাইমে হলুদ, মরিচ মেশান? তাহলে ভাই যেই পার্ফিউমে গ্যালাক্সোলাইড দরকার নাই, তাতে গ্যালাক্সোলাইড দিবেন কেন? যেখানে যা দরকার নাই সেখানে সেটা দিলে তো ঐ পোলাও তে হলুদ গুড়াই দেয়া হলো। পার্ফিউম বানাতে গেলেও রেসিপি আছে, বোঝাপোড়া আছে। আপনি আন্দাজে কোনো একটা কিছু বানিয়ে মানুষের ক্ষতি করতে পারেন না৷
.
আপনি কি বুঝেন একটা পার্ফিউমে কখন Aurelione ইউজ করতে হয় কখন Helvetolide ইউজ করতে হয়? কখন Manzanate ইউজ করতে হয়? বাদ দেন ভাই, অয়েল মিক্স করা ছাড়া পার্ফিউমের টপ, মিডেল, বেইজ নোট ক্রিয়েট কিভাবে হয় শুধু অ্যাকর্ডের ব্লেণ্ডিং এর মাধ্যমে বলেন তো? জানা আছে? তাহলে কি বানায় বেঁচেন আপনারা? দুই পয়সা উপার্জন করার মতো আপনারা যা দিচ্ছেন হতে পারে সেগুলো একসময় কারো ফুসফুস বিকল করে দিবে, কারণ একটা পার্ফিউমের গ্রেড অত্যন্ত ইম্পর্ট্যান্ট তারচেয়েও ইম্পর্ট্যান্ট সলভেন্ট গ্রেডফুল হওয়া, এগুলো খুবই সেন্সিটিভ ব্যাপার৷ পার্ফিউমের ফিক্সেটিভ এর একটা মেজারমেন্ট আছে স্প্রে করার পর মলিকিউল এর প্রেশার কেমন হবে তা এই ফিক্সেটিভের উপর ডিপেণ্ড করবে, কিন্তু আন্দাজে ফিক্সেটিভ ইউজ করলে ওপেনিং যা-ই দেক বেইজ দেখবেন নষ্ট হওয়ার চান্স প্রবল৷ তবে দোষ যে শুধু সেলারের তা তো না, আমাদের দেশের কনজিউমার প্রচুর পরিমাণে লোভী, সবসময় অল্প টাকায় বেশি পাওয়ার আশা করে, যেটা আপনি পাবেন না, একটা পার্ফিউমে লাস্টিং আর প্রজেকশন বাড়ানো কোনো ব্যাপার না, ক্ষতিকর নাইট্রোমাস্ক মেশালেই হয়ে যায়৷ তাই সবার আগে আপনারা মূর্খ বাটপার আনকোয়াফাইডদের থেকে কেনা বন্ধ করেন, ওরা এমনিতেই সাইজ হয়ে যাবে৷