ছবিতে যেই বোতলটা দেখতে পাচ্ছেন এতে আনুমানিক ৪ গ্রামের কাছাকাছি Kinam Oud আছে যার মূল্য ৩ লাখ ২২ হাজার টাকা৷ জি অনেক তথাকথিত নিশ পার্ফিউমের চেয়ে অনেক বেশি মূল্য এর কারণ এটা ১৮৮ বছর পুরনো একটা জিনিস, সুপার আল্ট্রা নিশ এবং পৃথিবীর সবচেয়ে দামী আগর অউদ। গতকাল আমি একটা পোস্ট করার পর অনেকেই জানতে চেয়েছে যে Kinam Oud জিনিসটা কি? এখন সেটা বুঝতে হলে অনেক কথা বলার আছে, আপনার যদি ধৈর্য্য থাকেন তাহলে পড়তে পারেন কারণ পোস্টটা একটু বড়ই হবে, তবে কথা দিচ্ছি যে বিন্দুমাত্র বোর হবেন না৷
.
কিনাম অউদ কে বোঝার আগে আপনার আগর অউদ কি সেটা বুঝতে হবে, আগর (Agarwood / Oud / Aloeswood) আসলে একটি বিশেষ ধরনের সুগন্ধি কাঠ, যা নির্দিষ্ট কিছু গাছের ভেতরে তৈরি হয়। সবচেয়ে পরিচিত গাছ হলো Aquilaria genus-এর গাছ। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাংলাদেশ, ভারত, আসাম, মিয়ানমার, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম, লাওস, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় এই গাছ পাওয়া যায়। কিন্তু লক্ষ্যনীয় ব্যাপার হলো, সব Aquilaria গাছ থেকে কিন্তু আগর হয় না।
.
সাধারণ অবস্থায় এই গাছের কাঠ প্রায় গন্ধহীন ও হালকা রঙের হয়। আগর তৈরি হয় তখন, যখন গাছটি কোনোভাবে আঘাতপ্রাপ্ত বা সংক্রমিত হয়। ধরেন, গাছে যদি ছিদ্র হয়, বজ্রপাত বা ঝড়ের ক্ষতি হয়, পোকা ঢোকে fungus বা microbial infection হয়, তখন গাছটা নিজেকে বাঁচানোর জন্য ভিতরে একটি ডার্ক অ্যারোম্যাটিক রেজিন তৈরি করতে শুরু করে। এই রেজিন ধীরে ধীরে কাঠের মধ্যে জমে যায়। বছরের পর বছর ধরে ওই অংশ কালচে, ভারী এবং সুগন্ধিযুক্ত হয়ে ওঠে, এই সুগন্ধিটাই হচ্ছে আগর বা অউদ।
.
এখন আগরের মধ্যে আবার বহুভাগ বা ক্যাটাগরি আছে, অনেকে ভাবে সিলেটের আগরই সবচেয়ে দামী তবে এটা ভুল৷ আগর দামী বা অদামীর নির্ণয় হয় সেটা কত বেশি রেয়ার তার উপর। আগরের রেজিন যত বেশি সেটার দাম ততো বেশি৷ সাধারণ সাদা কাঠ পানিতে ভাসে। কিন্তু resin-heavy আগর অনেক সময় ডুবে যায়। এজন্য “sinking grade oud” খুবই মূল্যবান ধরা হয়। আবার আগরের দাম নির্ধারিত হয় সেটা কাল্টিভেটেড নাকি ওয়াইল্ড অর্গানিক তার উপরেও, আর এই ওয়াইল্ড অর্গানিক কথাটার সাথেই কিনামের নাম জড়িত।
.
Kinam Oud (যেটাকে Kyara, Qinan, Kynam নামেও ডাকা হয়) হলো অউদের জগতে “Holy Grail”। এটা অতি বিরল এক ধরনের resin-rich agarwood, যেটা শত শত বছর ধরে গাছের ভিতরে বিশেষ পরিবেশে তৈরি অর্গানিকভাবেই হয়। অনেক অউদ প্রেমী পুরো জীবনেও আসল Kinam স্মেল করার সুযোগ পায় না, সেখানে ১৮৮ বছরেরটা তো বহু দূরের কথা। সাধারণত ১০,০০০টা গাছের মধ্যে হয়তো ১টাতে আসল Kinam তৈরি হয়। কিন্তু এটা এতো বেশি রেয়ার হওয়ার পেছনে আরো কিছু কারণ আছে৷
.
প্রথমত এটা অত্যন্ত রেয়ার আর সব Aquilaria গাছে Kinam তৈরি হয় না, ওয়াইল্ড কিনাম প্রায় বিলুপ্তির কাছাকাছি, এবং এর রেইজিন কন্সেস্ট্রেশন অস্বাভাবিক বেশি, কিনামের সেন্ট কমপ্লেক্সিটি অন্য সব অউদের চেয়ে আলাদা যেহেতু এটা তৈরি হতে শত সহস্র বছর সময় লাগে এবং এর অয়েল ইয়েল্ড খুবই কম। সাধারণ অউদ রেজিনাস হয়, কিন্তু কিনামের রেজিন প্রায় ওয়াক্স হানির মতো নরম কিন্তু এর অয়েলটা ব্যাপক হেভি এবং আসল কিনাম কাঠ ছুরি দিয়ে স্ক্র্যাপ করলে রেজিন বের হয়ে আসে। যেটা আগরের সবচেয়ে রেয়ার কেইস। কিন্তু কিনামের স্মেল কেমন? আসলে Kinam-এর স্মেলের বর্ণনা করা খুব কঠিন। কারণ এটা linear না বরং এর স্মেল কন্সট্যান্টলি ইভলভ করে এবং এটা বেশ হিপ্নোটিক একটা স্মেল৷
.
আগরের মধ্যে পৃথিবীতে একমাত্র কিনামই আছে যেটাতে কুল মিন্ট, হানি, ইন্টেন্স ডার্ক, হার্বাল উডি, ওয়ার্ম বালসামিক এবং ওল্ড লাইব্রেরির একটা স্মেল পাওয়া যায় এবং অনেকক্ষণ যাবৎ কিনামের ঘ্রাণের মাঝে থাকলে এক ধরণের হিপ্নোটিজম বা গুড ম্যাডনেস ক্রিয়েট হয়, খুবই আধ্যাত্মিক ফিলিংস আসে যেটা খুবই রেয়ার ফিলিংস দেয়। কিনাম মূলত চায়না, জাপান, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া (লাওসে) পাওয়া যায়।
.
তবে যেটা কিনামের হলি গ্রেইল হিসেবে সমাদৃত এবং এক্সট্রীমলি রেয়ার এবং এক্সপেন্সিভ সেটা আসে চায়নার হাইনান দ্বীপ থেকে৷ এই হাইনান দ্বীপের উঊজি পাহাড়ের কিনাম আবার সবচাইতে রেয়ার (যেটা ছবিতে দেখতে পাচ্ছেন), বলা হয় সর্বপ্রথম এর খোঁজ করেছিলো বোধিধার্মা। Wuzhi Mountain Bawangling এর কিনামে একটা ফ্রুটি, ফ্লোরাল, কুল টোন থাকে যেটা অউদের মধ্যে পাওয়া প্রায় অসম্ভব জিনিস৷ এটাও একটা কারণ কিনামের রেয়ার হওয়ার জন্য।
.
কিনাম বর্তমানে কাল্টিভেটেড আকারে পাওয়া গেলেও, ছবিতে যেই কিনামটি দেখতে পাচ্ছেন এটা পিওর ওয়াইল্ড এবং ১৮৮ বছর পুরনো ডিস্টিল্ড ফ্রম দ্যি চাইনিজ আগরউড লেজেণ্ডারি হাউজ Shî Yaņg of Bawangling, আগর কেন্দ্রীক ওদের ব্যবসা প্রায় ১৮০০ বছরের পুরনো। পৃথিবীর ইতিহাসে হয়তো তারাই সবচাইতে পুরনো বংশীয় ব্যবসা করে, যদিও তাদের পরিচিতি খুবই সীমিত কারণ এটা মাও-জে-দং এর টাইম থেকেই চাইনিজ গভমেন্টের আণ্ডারে চলে গেছে।
.
তান রাজবংশ সর্বপ্রথম কিনামকে পবিত্র সুগন্ধির তকমা দেয় এবং সম্রাট তাইজং তাং রেগুলার কিনাম ব্যবহার করতেন এবং সেটা শি ইয়াং বংশের পূর্বপুরুষরাই তাকে পৌঁছে দিতো, মজার ব্যাপার হলো সেই সেইম কিনামই একটা আমার কাছে আছে, মনে হয় যেন সুঘ্রাণ নিয়ে পুরো একটি ইতিহাস-কে দেখছি৷ এর দাম আসলে শত কোটি টাকা হলেও অনেক কম৷ ইভেন আল হারামাইনও ৫ মি.লি.কিনাম সেল করে ৬ লাখে সেই তুলনায় তো আমারটা ফ্রি তেই পাওয়া বলা যায়৷